শাবিপ্রবি প্রতিনিধি
পেটে লাথি মারা বন্ধ হোক, সহানুভূতি নয়, অধিকার চাই, স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চাই এমন লিখা সংবলিত প্লেকার্ড হাতে নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) তিন দফা দাবির আন্দোলনে পুলিশের হামলায় গুরুতর আহত শিক্ষার্থী সজল কুন্ডু। ওইদিন পুলিশের হামলায় সজলের শরীরে ৮৩টি স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়।
রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সামনে দুইটি প্লেকার্ড হাতে নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে আহত শিক্ষার্থী স্বজল কুন্ডু। দুইটি প্লেকার্ডে লিখা আছে, ‘পেটে লাথি মারা বন্ধ হোক, সহানুভূতি নয়, অধিকার চাই, স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে
অবস্থান কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে সজল কুন্ডু বলেন, গত ১৬ জানুয়ারি সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির আন্দোলনে পুলিশ নির্মমভাবে হামলা চালায়। সে হামলায় আমি মারাত্মকভাবে আহত হই এবং ক্ষতিগ্রস্ত হই।
তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় শিক্ষামন্ত্রী আশ্বস্ত করেছিল যে শিক্ষার্থীদের ৫ দফা দাবি মেনে নেয়া হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মামলা তুলে দেওয়া হয়নি, একটি একাউন্ট এখনো পর্যন্ত ফ্রিজিং করে রাখা হয়েছে, যেখানে ৪০ হাজারের মতো টাকা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, আমার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দুটি দাবি জানানো হয়েছিল। একটি আমার আর্থিক ক্ষতিপূরণ, অন্যটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার একটা চাকরির ব্যবস্থা করা। কিন্তু সেই দাবি মেনে নেওয়া তো দূরের কথা, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইসিটি ভবনে যে ক্যাফেটেরিয়ায় চালিয়ে রুটি-রোজগার করতাম সেটিও আন্দোলনের ঈর্ষার ফলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, গত পাঁচ মাস যাবত সে ক্যান্টিন বন্ধ রয়েছে। আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের কোনো দাবি তো মেনে নেয়া হয়নি, উল্টো আমার পেটে লাথি মেরে আমার রুটি-রোজগার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।আমার সাথে যে অন্যায় হয়েছে এর প্রতিবাদে এখানে দাঁড়িয়েছি।
আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও চাকরির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাকরি এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো আমার ক্যাফেটেরিয়া কেরে নেওয়া হয়েছে। এতে চাকরি এবং ক্ষতিপূরণ আশা করাটা বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়। সবচেয়ে বড় কথা আমি আহত হওয়ার পর যে চিকিৎসার ভরণপোষণ করার কথা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটিও বন্ধ করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে ঈর্ষার ফলে আমার সাথে এ ধরনের আচরণ করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, শুধুমাত্র আমার সাথে এমন করা হচ্ছে তা কিন্তু নয়। এই আন্দোলনে যে সকল শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিল তাদেরকেও ক্লাস এবং ক্লাসের বাইরেও বিভিন্নভাবে বুলিং করা হচ্ছে। এতে অনশনকারী পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর থিসিস পেপার আটকে দেওয়া হয়েছে, বিএনসিসির একজন শিক্ষার্থীর ক্যাডেটশীপ বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতিহিংসার বশীভূত হয়ে আমার সাথে এমন ধরনের আচরণ করছে।
শিক্ষার্থীদের পাঁচটি দাবি এবং আটটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে সেগুলো পূরণের জোর দাবি জানাচ্ছি। আমি সরকারের উচ্চ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, শিক্ষামন্ত্রীসহ যারা শিক্ষার্থীদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেগুলো মেনে নিতে। আমার সাথে যে অন্যায় হয়েছে, আমি যে ক্যান্টিং চালিয়েছিলেন সেটি আমাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে ফিরিয়ে দিয়ে আমার রুটি-রোজগারের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ নিয়ে প্রশাসনের সাথে কথা হয়েছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দাবি নিয়ে মধ্যস্থতা করেছিল ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার, তিনি আসার পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অনশন ভেঙ্গে আন্দোলন থেকে সরে এসেছে। আমাদের সাথে উনার যোগাযোগ এখনো অব্যাহত আছ, কিন্তু তিনি এখনো সুস্পষ্ট করে কোন কিছু বলতে পারছেন না। আন্দোলনের ৮ মাস পার হয়ে গেলেও এখনো কোনো দাবি বাস্তবায়ন বা মেনে নেওয়া হয়নি। আমি আশঙ্কা করছি, শিক্ষার্থীদের যে মামলাগুলো দেয়া হয়েছে সেগুলো এখনও তুলে নেয়া হয়নি, এগুলো যে কোন সময় বাস্তবায়ন করা হতে পারে। কারণ এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হচ্ছে নিপীড়ক, তারা যে কোন সময় শিক্ষার্থীদের নিপীড়ন করতে পারে।
অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জবাবে তিনি বলেন, আমার শারীরিক অবস্থা ভাল না আমি অসুস্থ, প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা করে আমি অবস্থান কর্মসূচি পালন করব, যতদিন পর্যন্ত আমার দাবী মেনে নেয়া হবে না, ততদিন পর্যন্ত এ অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাব।
প্রসঙ্গত, গত ১৬ জানুয়ারি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের শটগান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের সময় ৮৩টি স্প্লিন্টারে গুরুতর আহত হয় সজল কুন্ডু। পরে শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করা হলেও এখন পর্যন্ত মূলদাবিসহ কোনো দাবি পুরণ না হওয়ায় উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন স্বজল। অন্যদিকে চলতি বছর ২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইসিটি ভবনের ক্যাফেটেরিয়া পরিচালনার দায়িত্ব নেয় সজল কুন্ডু। পরে ক্যাম্পাসে আন্দোলন শুরু হলে ১৬ জানুয়ারি সেটি বন্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে পুনরায় ক্যাফেটেরিয়া চালু করেন তিনি। তবে ঈদের ছুটির সময় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তার কাছ থেকে ক্যাফেটেরিয়ার চাবি নিয়ে নেওয়া নেয় প্রশাসন। পরে ক্যাম্পাস খুললেও বিভিন্ন ইস্যুর কারণ দেখিয়ে তাকে আর ক্যাফেটেরিয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এছাড়া, ১৬ জানুয়ারি পুলিশি হামলায় আহত শিক্ষার্থীদের সকল চিকিৎসা ব্যয়ভার বহন করা হবে উল্লেখ করে ১৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার মো. ইশফাকুল স্বাক্ষরিত একটি নোটিশ দেওয়া হয়।



