বগুড়া প্রতিনিধি

বগুড়ায় ৭ বছর বয়সী শিশু মাহি উম্মে তাবাচ্ছুমকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ৪ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লক্ষ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে, অনাদায়ে এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রবিবার বেলা সাড়ে ১২টায় নারী ও নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর এই রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- জেলার ধুনট উপজেলার নশরতপুর এলাকার মো. বাপ্পী আহম্মেদ (২২), কামাল পাশা (৩৫), শামীম রেজা (২২) ও লাভলু শেখ (২১)।

রাষ্ট্রেপক্ষের বিশেষ আইনজীবী আশিকুর রহমান সুজন সাংবাদিকদের জানান, আসামিরা গত ২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর ধনুট উপজেলার নছরতপুর গ্রামের বেলাল হোসেনের একমাত্র মেয়ে ৭ বছর বয়সী তাবাচ্ছুমকে ধর্ষণ করে বাঁশঝাড়ের মধ্যে ফেলে রেখে যায়।

পরে শিশুটিকে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ওই দিন রাত দেড়টায় পরিবারের লোকজন তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্মরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরে তারা ধনুট থানায় একজনসহ অজ্ঞাতমানা আরও কয়েক জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে তদন্ত সাপেক্ষে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়।

তিনি আরও জানান, রবিবার (২৩ অক্টোবর) আসামীদের উপস্থিতিতে ৪ জনকে মৃত্যুদন্ড রায় ঘোষণা করা হয়।
উল্লেখ্য, বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার নশরতপুর গ্রামের বেলাল হোসেন খোকন ও তার স্ত্রী মরিয়ম ডেইজি ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করতেন। তাদের মেয়ে মাহী উম্মে তাবাচ্ছুম দাদা আবদুস সবুরের বাড়িতে থেকে স্থানীয় পাঁচথুপি-নশরতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত।

২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌস কবরস্থান চত্বরে দুই দিনব্যাপী তাফসিরুল কোরআন মাহফিলের আয়োজন করা হয়। শিশু তাবাচ্ছুম তার দাদা ও ফুফুর সঙ্গে তাফসির শুনতে যায়।
একপর্যায়ে রাত ১০টার দিকে সে মিষ্টি কিনতে মঞ্চের পাশের দোকানে যায়।

সেখানে খোকনের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ থাকা কলেজছাত্র বাপ্পী আহমেদ তাফসিরে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বাপ্পী শিশুটিকে দেখতে পেয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। সে বাদাম কিনে দেয়ার কথা বলে তাবাচ্ছুমকে স্থানীয় হাজী কাজেম জুবেদা টেকনিক্যাল কলেজে নিয়ে যায়। সেখানে বাপ্পী ও তার তিন বন্ধু কামাল পাশা, শামীম রেজা ও লাবলু শেখ শিশুটিকে ধর্ষণ করে। পরে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

এ ছাড়া তাকে কোনো প্রাণী আক্রমণ করে হত্যা করেছে এমন প্রমাণ করতে প্লাস দিয়ে হাতের একটি আঙুল কেটে দেওয়া হয়। এরপর মরদেহটি কাঁধে তুলে মঞ্চের কাছে বাদশা মিয়ার বাঁশঝাঁড়ে ফেলে দেয়া হয়।

পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। পরেরদিন ১৫ ডিসেম্বর নিহত তাবাচ্ছুমের বাবা খোকন

অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।
এ ঘটনায় পুলিশ বাপ্পীর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধকে সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে। সন্দেহভাজন বাপ্পী ও তার তিন বন্ধুকে পর্যেবক্ষণে রাখে পুলিশ।

২৫ ডিসেম্বর রাতে প্রথমে বাড়ি থেকে শামীম রেজাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার স্বীকারোক্তিতে নিজ নিজ বাড়ি থেকে বাপ্পী, রেজা ও লাবলুকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে চারজনই শিশু তাবাচ্ছুমকে ধর্ষণ এবং হত্যার কথা স্বীকার করে।

এরপর ২০২১ সালের ২৫ অক্টোবর চারজনকে অভিযুক্ত করে ধুনট থানার তৎকালীন ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাহিদুল হক চার্জশিট জমা দেন। সব সাক্ষ্য প্রমাণ শেষে আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
তাবাচ্ছুমের মা মোছা. মরিয়ম ডেইজি বলেন, আমার মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আদালত যে রায় দিয়েছেন তাতে আমরা সন্তুষ্ট।
তবে রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছে আসামিপক্ষের আইনজীবী।