নিজস্ব প্রতিবেদক

ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম রেকর্ড ভেঙেছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঠিক রাখতে এ খাতে ভর্তুকি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে খাতটিতে ভর্তুকি চলতি অর্থবছরের চেয়ে আরও বাড়ানো হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মূল্য সমন্বয় করা না হলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের জন্য আসন্ন অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। যা চলতি বছরের চেয়ে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা।

সূত্র জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য যে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে তার মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের জন্য প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা আর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ খাতের জন্য ১৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করা না হলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আমদানি মূল্য পরিশোধ এবং প্রণোদনা প্যাকেজের সুদ ভর্তুকি প্রদানের নিমিত্ত অন্যান্য ভর্তুকি খাতে আগামী অর্থবছরে এ পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে বলে অনুমান করেছে অর্থ বিভাগ।

আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে ভর্তুকির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা গত পাঁচ অর্থবছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৯২০ কোটি এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, ‘অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে জ্বালানি সংকট উত্তরণের জন্য ভর্তুকির প্রয়োজন রয়েছে। দেশে প্রতিদিন ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চুরি হচ্ছে। এ চুরি বন্ধ করা গেলে স্পট  মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে হতো না। জ্বালানির খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনে নেতৃত্বের ব্যর্থতা রয়েছে। আমরা এখনো কয়লা ও গ্যাস অনুসন্ধানে অনেক পিছিয়ে আছি। ’

তিনি বলেন, ‘সরকার জ্বালানি সংগ্রহে যতটা তৎপর জ্বালানি সাশ্রয়ে তেমন নয়। ডিজেলের দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশ। অথচ পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ২৮ শতাংশ। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির অনুপাতে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি হওয়া উচিত ছিল ৮-১০ শতাংশ। ’
এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঠিক রাখতে এ খাতে সরকারকে ভর্তুকি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। গত মার্চে তিনি বলেছিলেন, ‘এক বছরেরও বেশি সময় থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তি। বিশেষ করে ডিজেলের দাম গত কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। যদিও আমরা চেষ্টা করছি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে। যদি মূল্য বৃদ্ধির সীমা ছাড়িয়ে যায় তবে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ’

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এখন প্রতিদিন ৮০ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। যা মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এভাবে চলতে থাকলে তো বিপদ। ’
২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। ইতিমধ্যে ২৫ হাজার ৫৬৬ মেগাওয়াট (ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ) উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। বাকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ কারণে সরকার প্রতি বছর বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পাওয়া যাবে জানিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের সমস্যা হবে। সেটা চিন্তা করে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে। যে কারণে ভর্তুকি বাড়ছে। তবে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে ভর্তুকির পরিমাণ কমে যাবে। একটা সময় আসবে যখন আর ভর্তুকি দিতে হবে না। আমরা মুনাফা করতে পারব। ’